সম্পূর্ণ বিনামূল্যে খতিয়ান (RoR) ও প্লট ইনফরমেশন: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এক ঐতিহাসিক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত
পশ্চিমবঙ্গের জমি-জায়গা সংক্রান্ত পরিষেবায় এক অভূতপূর্ব এবং ঐতিহাসিক পরিবর্তন নিয়ে এলো রাজ্য সরকার। এখন থেকে বাংলার সাধারণ নাগরিকরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (Free of Cost) তাঁদের জমির খতিয়ান (Khatian/RoR) বা ‘রেকর্ড অফ রাইটস’ (Record-of-Rights) এবং প্লটের বিবরণ বা ‘প্লট ইনফরমেশন’ (Plot Information) অনলাইনের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে পারবেন। এই সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, যা বাংলার কোটি কোটি মানুষের জন্য অত্যন্ত স্বস্তির খবর।
আসুন এই নির্দেশিকা সম্পর্কে বিস্তারিত, সহজ ভাষায় এবং প্রতিটি পয়েন্ট ধরে জেনে নেওয়া যাক।
বিজ্ঞপ্তির মূল বিবরণ ও আইনি প্রেক্ষাপট (Notification Overview)
বিস্তারিত বিজ্ঞাপনের অংশঃ
মেমো নম্বর (Notification No.): 200-Budget(General)/LL/O/1B-16/2026
প্রকাশের তারিখ (Date): ০২ জুলাই, ২০২৬ (02/07/2026)
দপ্তর: বাজেট শাখা, নবান্ন, হাওড়া – ৭১১১০২ (Budget Branch, Nabanna)
অনুমোদন: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অর্থ দপ্তরের (Finance Department) সম্মতি এবং মহামান্য রাজ্যপালের (Governor) আদেশক্রমে এই নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। অর্থ দপ্তরের U.O No. Group A-II/2026-2027/0063 (তারিখ: ৩০.০৬.২০২৬)-এর ভিত্তিতে এটি অনুমোদিত হয়েছে।
আইনি ক্ষমতা: ১৯৫৫ সালের পশ্চিমবঙ্গ ভূমি সংস্কার আইনের (West Bengal Land Reforms Act, 1955) ৫৭ নম্বর ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এবং অন্যান্য সমস্ত সহায়তাকারী ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে, রাজ্যপাল ১৯৪৩ সালের ‘বেঙ্গল রেকর্ডস ম্যানুয়াল’ (Bengal Records Manual, 1943)-এ একটি বড়সড় সংশোধন এনেছেন। এই সংশোধনীর ফলেই অনলাইন পরিষেবা সম্পূর্ণ ফ্রি করা সম্ভব হয়েছে।

কী কী বড় পরিবর্তন এলো? সংশোধিত নিয়মের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী মূলত দুটি প্রধান নিয়মে সংশোধন বা পরিবর্তন আনা হয়েছে। নিচে এই সংশোধনী দুটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. রুল ৩২০এইচ (Amendment of Rule 320H) – খতিয়ান সংক্রান্ত নিয়ম
এর আগে ডিজিটাইজড খতিয়ান বা রেকর্ড অফ রাইটস (RoR) ডাউনলোডের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি ফি বা চার্জ দিতে হতো। কিন্তু নতুন সংশোধিত ৩২০এইচ নিয়ম অনুযায়ী:
সম্পূর্ণ ফ্রি: যেকোনো আবেদনকারী অনলাইনে খতিয়ান (RoR) বা ব্যক্তি-ভিত্তিক রেকর্ড অফ রাইটস-এর জন্য আবেদন করলে, ডিজিটাল ডেটাবেস থেকে সেটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা ‘Free of Cost’ পাবেন।
কোনো আবেদন বা যাচাইকরণ ফি নেই: খতিয়ানের পৃষ্ঠার সংখ্যা (Number of pages) যত বেশিই হোক না কেন, কোনো রকম আবেদন ফি (Application fee) বা যাচাইকরণ ফি (Authentication fee) দিতে হবে না।
আবেদনের ধরণ: একজন ব্যবহারকারী একক বা একাধিক (Single or multiple) আবেদনের মাধ্যমে অনলাইনে এই Digitally Signed খতিয়ানগুলোর (RoR) জন্য অ্যাপ্লাই করতে পারবেন।
২. রুল ৩২০আই (Amendment of Rule 320I) – প্লট ইনফরমেশন সংক্রান্ত নিয়ম
জমির ম্যাপ বা দাগ নম্বর অনুযায়ী প্লটের তথ্য জানার ক্ষেত্রেও নিয়ম বদলানো হয়েছে। সংশোধিত ৩২০আই নিয়ম অনুযায়ী:
ডিজিটাল সফট কপি ফ্রি: যেকোনো ব্যক্তি ইলেকট্রনিক মাধ্যমে (ওয়েবসাইট বা অ্যাপ) সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সংস্কার আইনের অধীনে থাকা যেকোনো ডিজিটাইজড প্লট ইনফরমেশনের ‘সফট কপি’ (Soft copy) পেতে পারেন।
ডিজিটাল সিগনেচার যুক্ত কপি: এই ডিজিটালি সাইনড সফট কপি ডাউনলোড করার জন্য কোনো প্রকার আবেদন ফি বা অথেন্টিকেশন ফি প্রযোজ্য হবে না।
⚠️ গুরুত্বপূর্ণ নোট: বিজ্ঞপ্তিতে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, এই ফ্রি পরিষেবাটি শুধুমাত্র অনলাইন বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ডিজিটালি সাইনড কপির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোনো নাগরিক যদি সার্টিফাইড হার্ড কপি (Certified hard copies) বা অন্য কোনো কাগজের নথির জন্য সরাসরি অফিসে আবেদন করেন, তবে তার জন্য পূর্বনির্ধারিত সরকারি ফি বা চার্জ যথারীতি বহাল থাকবে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য কী?
নবান্নের পক্ষ থেকে জারি করা এই বিজ্ঞপ্তিতে এই ঐতিহাসিক সংস্কারের পেছনে মূল কারণ ও লক্ষ্যগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:
পাবলিক সার্ভিসের সহজলভ্যতা (Ease of access to public services): সাধারণ মানুষ যাতে ঘরে বসেই খুব সহজে এবং কোনো ঝামেলা ছাড়াই সরকারি পরিষেবা নিজের মোবাইল বা কম্পিউটারে পেতে পারেন, তার ব্যবস্থা করা।
আর্থিক বোঝা হ্রাস (Reduce the financial burden on citizens): সাধারণ নাগরিকদের, বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক চাষীদের ওপর থেকে জমির কাগজ তোলার জন্য বাড়তি আর্থিক খরচের বোঝা দূর করা।
স্বচ্ছতা বৃদ্ধি (Promote transparency): অনলাইন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ফ্রি করার মাধ্যমে দালাল চক্রের দাপট কমানো এবং ভূমি সংস্কার দপ্তরের কাজের গতি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
ঝামেলাহীন ইলেকট্রনিক ডেলিভারি (Hassle-free electronic delivery): তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কাগজের ফাইলের চক্কর কেটে সাধারণ মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট না করে, দ্রুততার সাথে ল্যান্ড-রেকর্ড মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে দেওয়া।
সাধারণ মানুষের জন্য এর সুবিধা ও প্রভাব (Benefits for Common People)
বাংলার ভূমি (Banglarbhumi) পোর্টাল ব্যবহারে স্বস্তি: বাংলার কোটি কোটি মানুষ জমির খতিয়ান (RoR) এবং প্লটের তথ্য দেখতে ‘বাংলার ভূমি’ পোর্টাল বা এর অফিশিয়াল অ্যাপ ব্যবহার করেন। এখন থেকে কোনো ফি ছাড়াই অফিসিয়াল বা লিগ্যাল কাজের জন্য ডিজিটালি সাইনড কপি ডাউনলোড করা যাবে, যা আগে টাকা দিয়ে করতে হতো।
লোন বা ব্যাংক ঋণের সুবিধা: বাড়ি বা জমির ওপর লোন নেওয়ার সময় ব্যাংকগুলো সাধারণত আপডেটেড খতিয়ান বা RoR দেখতে চায়। এখন সাধারণ মানুষ তৎক্ষণাৎ কোনো খরচ ছাড়াই পোর্টাল থেকে এই নথি ডাউনলোড করে ব্যাংকে জমা দিতে পারবেন।
জমি কেনাবেচায় সুবিধা: কোনো জমি কেনার আগে তার আসল মালিক কে বা জমির বর্তমান চরিত্র (শ্রেণী) কেমন, তা জানতে প্লট ইনফরমেশন খুবই জরুরি। এখন ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরাসরি সরকারি সাইট থেকে আসল তথ্য যাচাই করে নিতে পারবেন। ফলে জালিয়াতির সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাবে।
দালাল রাজের অবসান: গ্রামীণ বা আধা-শহুরে এলাকায় সাধারণ মানুষ কম্পিউটার বা অনলাইনের কাজে দক্ষ না হওয়ার কারণে সাইবার ক্যাফে বা দালালের কাছে গিয়ে খতিয়ানের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করতেন। এখন ফ্রি হয়ে যাওয়ায় মানুষ নিজের ফোন থেকেই এই কাজ সহজে করতে পারবেন এবং অসাধু চক্রের প্রতারণা বন্ধ হবে।

কীভাবে অনলাইনে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে খতিয়ান (RoR) ও প্লট ইনফরমেশন ডাউনলোড করবেন? (Step-by-Step Guide)
যদিও অফিসিয়াল পদ্ধতিতে কিছুটা সময় লাগতে পারে, তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমি সংস্কার দপ্তরের অফিশিয়াল পোর্টাল Banglarbhumi (banglarbhumi.gov.in) ব্যবহার করে আপনি এই সুবিধাটি নিতে পারবেন। নিচে সাধারণ নির্দেশিকা দেওয়া হলো:
রেজিস্ট্রেশন ও লগইন: প্রথমে বাংলারভূমি পোর্টালে গিয়ে আপনার নাম ও মোবাইল নম্বর দিয়ে একটি ‘Citizen Account’ তৈরি করে লগইন করুন।
পরিষেবা নির্বাচন: মেনু বার থেকে ‘Citizen Services’ অপশনে ক্লিক করুন। সেখানে ‘Service Delivery’ অপশনের অধীনে ‘ROR Request’ বা ‘Plot Info Request’ দেখতে পাবেন।
তথ্য প্রদান: আপনার নির্দিষ্ট জেলা (District), ব্লক (Block) এবং মৌজা (Mouza) সিলেক্ট করুন। এরপর খতিয়ান (RoR) নম্বর বা দাগ (Plot) নম্বরটি ইনপুট করুন।
ফ্রি ডাউনলোড: নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আগে যেখানে পেমেন্ট গেটওয়েতে গিয়ে টাকা কাটতে হতো, এখন সেখানে কোনো ফি ছাড়াই ডিজিটালি সাইনড কপির রিকোয়েস্ট সাবমিট করা যাবে এবং সেটি প্রসেস হওয়ার পর আপনি সরাসরি পিডিএফ (PDF) আকারে ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।
০২ জুলাই, ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে একটি প্রগতিশীল এবং জনমুখী পদক্ষেপ। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিখরচায় সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা ডিজিটাল ইন্ডিয়া এবং ডিজিটাল বাংলার রূপরেখাকে আরও মজবুত করবে।
আপনিও যদি আপনার জমির বর্তমান স্ট্যাটাস জানতে চান বা খতিয়ানের কপি ডাউনলোড করতে চান, তবে আজই কোনো ফি ছাড়াই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমি সংস্কার পোর্টাল ভিজিট করে এই চমৎকার নাগরিক সুবিধার লাভ তুলুন।
ℹ️ তথ্য যাচাই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি
WBBulletin প্রকাশিত প্রতিটি সংবাদ যথাসম্ভব নির্ভুল, নির্ভরযোগ্য এবং সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়।
তবে সরকারি চাকরি, শিক্ষা, পরীক্ষা, প্রকল্প, নিয়োগ, ফলাফল, ভর্তির বিজ্ঞপ্তি বা অন্যান্য সরকারি তথ্য সময়ে সময়ে সংশোধিত অথবা পরিবর্তিত হতে পারে।
তাই আবেদন, নিবন্ধন বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথবা সংস্থার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এবং মূল বিজ্ঞপ্তি অবশ্যই যাচাই করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হচ্ছে।
কোনো তথ্যগত ভুল বা অসঙ্গতি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে আমাদের Contact Us পেজের মাধ্যমে জানান।


